তরমুজ চাষে জৈব পদ্ধতিতে কৃষকের সাফল্য।
- আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে

সাব্বির আলম বাবু, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
তরমুজ চাষে জৈব পদ্ধতিতে কৃষকের সাফল্য। খরচ কম- লাভ ও স্বাদ বেশী। ‘আগে তরমুজ চাষ করে লাভ হতো না, এবার নতুন পদ্ধতিতে চাষ করেছি। এতে খরচ কমেছে। ফলনও বেশি হয়েছে।’ কথাগুলো বলছিলেন ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার চাষি ইসমাইল মাঝি। কখনও নিজের জমিতে, কখনও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তরমুজ চাষ করেন আবুবকরপুর ইউনিয়নের এই কৃষক। তিনি জানান, গত বছর বাজারের কেনা বালাইনাশক ব্যবহারে তরমুজ চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনিসহ অনেক চাষি। এ বছর কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে তরমুজ আবাদ করে ফলন ভালো হওয়ায় তিনি লাভবান হয়েছেন। এ বছর তিনি আড়াই একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। জমি বর্গার টাকা ও আবাদ খরচ বাদ দিয়ে দুই লাখ টাকা পেয়েছেন। শুধু ইসমাইল মাঝি নন; চরফ্যাসনের অনেকেই জৈব সার ব্যবহারে তরমুজ চাষ করেছেন। কৃষকরা জানান, এই পদ্ধতিতে কীটনাশকের খরচ কম এবং রাসায়নিক সার ব্যবহার না করার কারণে তরমুজের আকার বড় হয়েছে। এগুলো বেশ মিষ্টি। দামও পাওয়া যায় বেশি। খরা আর লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দক্ষিণাঞ্চলের মাঠজুড়ে এখন তরমুজের সমারোহ। সবুজ লতাপাতার মধ্যে পরিপুষ্ট তরমুজ যেন হাসিমুখে উঁকি দিচ্ছে চারদিকে। রাসায়নিক নির্ভরতা থেকে সরে এসে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের দিকে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। সেই সিদ্ধান্তই এনে দিয়েছে বাম্পার ফলন, কম খরচ আর নতুন আশা। ভোর থেকে শুরু হয় তরমুজ তোলার কাজ। শ্রমিকরা দলবেঁধে মাঠে যান। কেউ বাছাই করেন, কেউ আবার ট্রাকে তোলেন। গ্রামের ভেতরের কাঁচা রাস্তা দিয়ে একের পর এক ট্রাক ঢুকছে। অনেক জায়গায় রাস্তা এতটাই সরু যে ট্রাক যাওয়া কঠিন। তবু থেমে নেই গতি। নদীর ঘাটে গেলে দেখা যায় আরও বড় আয়োজন- কার্গো জলযান আর লঞ্চ ভিড়ছে, তরমুজ বোঝাই হচ্ছে। এগুলো যাচ্ছে বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকাররা এখন সরাসরি মাঠে হাজির। আগের মতো আড়তে অপেক্ষা নয়; এখন ক্ষেতেই লেনদেন। এই মৌসুমে চরফ্যাসনের গ্রামগুলোতে একটা ভিন্ন রকম প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। দিনমজুররা কাজ পান, নারীরা বাছাই ও পরিবহনে যুক্ত হন, কিশোররা ছোটখাটো কাজ করে আয় করে। এমনকি শিশুরাও আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে- তরমুজ কাটার সময় তাদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান বসে। কেউ তরমুজ কেটে বিক্রি করছে, কেউ পাইকারি দামে বিক্রি করছে। হাটবাজারে ভিড় বাড়ে। গ্রামের অর্থনীতি যেন হঠাৎ করেই গতি পায়। এই পুরো চিত্র দেখলে বোঝা যায়, একটা ফসল পুরো সমাজকে আলোড়িত করতে পারে।
চরফ্যাসন উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ১২ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। ইউনিয়নভিত্তিক বিস্তৃতি রয়েছে চরকলমী, মুজিবনগর, নজরুলনগর, নীলকমল, নুরাবাদ, আবুবকরপুর, আহম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়। চাষ হয়েছে গ্লোরি, হাইব্রিড, ড্রাগন, থাই সুপার, সাইকিং, বেঙ্গল কিং, গ্রেড ওয়ান, বিগ ফ্যামিলি, আনন্দসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ। কৃষকরা হঠাৎ করে জৈব পদ্ধতিতে আসেননি। এর পেছনে আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। গত বছর বাজার থেকে কেনা রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করে অনেক কৃষক লোকসানের মুখে পড়েন। ফলন কমে যায়, রোগবালাই বাড়ে, খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠে আসেনি। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে এ বছর অনেকে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার শুরু করেন। এতে তারা দেখেন, মাটির গুণাগুণ ভালো থাকে, রোগ কম হয়, খরচও কমে। সবচেয়ে বড় কথা, ফলন ভালো হয়।
তরমুজচাষি আজিজুর রহমান বলেন, ‘আগে বুঝতাম, বেশি ওষুধ মানে ভালো ফলন। এখন বুঝি, কম খরচে ঠিকমতো চাষ করলে ফলন ভালো হয়, লাভও হয়।’ চরফ্যাসন উপজেলার আবুবকরপুর ইউনিয়নের কৃষক শাকিল ফরাজী তিন একর জমিতে প্রথমবারের মতো জৈব পদ্ধতিতে চাষ করেছেন। তাঁর ক্ষেতের ফলন অন্যদের তুলনায় বেশি হয়েছে। শাকিল বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কখন চারা রোপণ করতে হবে, কীভাবে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে- এসব শেখানো হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনী প্লট করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা দেখে শিখতে পারেন।
চরফ্যাসন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, তরমুজ চাষে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে তরমুজের দিকে ঝুঁকছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর চাষ বেশি হয়েছে। ১২ হাজার ৮৭৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক সহজলভ্য হওয়ায় এসব ব্যবহারে প্রায় ৪০ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন চাষিরা। আশা করি, আগামী বছর এই পদ্ধতির প্রতি কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে। তিনি বলেন, রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করে তরমুজের আবাদ সম্ভব। টিস্যু কালচার প্রকল্পের আওতায় জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা প্রতিটি তরমুজ তিন থেকে পাঁচ কেজি ওজনের হয়। এ তরমুজের খাদ্যগুণ ও নান্দনিকতায় ক্রেতারা মুগ্ধ। এ জন্য দাম ভালো। অল্প খরচে কৃষকরা এ ফলের আবাদ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। আগামীতে কৃষকরা যাতে আরও ব্যাপক পরিসরে জৈব পদ্ধতিতে তরমুজের আবাদে উদ্বুদ্ধ হন, সেই পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, ভোলা জেলার চরফ্যাসনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তরমুজ চাষে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি উত্তম চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত জাতের চারা রোপণের বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রদর্শনী উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চরফ্যাসনে কোনো হর্টিকালচার সেন্টার নেই। প্রকল্পের আওতায় এখানে একটি হর্টিকালচার সেন্টার ও টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের উন্নতমানের চারাপ্রাপ্তি, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করে কৃষি উৎপাদন আরও বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



















