মরহুম আলহাজ্ব শাহছুফি হযরত মাওলানা জমির উদ্দিন (র.)
- আপডেট সময় : ০৪:১৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬ ৫২ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: কামরুল ইসলাম
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক জনপদের নাম টেকনাফ উপজেলা। এর পশ্চিম ও দক্ষিণে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, উত্তরে উখিয়া উপজেলা এবং পূর্বদিকে প্রবহমান সীমান্ত নদী নাফ নদী, যা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে পৃথক করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল পাহাড়, গাছপালা, লতাপাতা ও পাখির কলতানে সমৃদ্ধ। সমুদ্রের লোনাজলঘেরা পরিবেশের কারণে এখানকার আবহাওয়া মনোরম ও স্বাস্থ্যকর।
সীমান্ত অঞ্চল হওয়ায় অতীতে এই এলাকায় উন্নয়নের ঘাটতি ছিল। একসময় এখানে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম এবং মানুষের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ফলে ১৯৬০ সালের পর অনেক মানুষ পরিবারসহ পাকিস্তান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তি বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশে পাঠান, যার ফলে এলাকার মানুষের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
বর্তমান দক্ষিণ হ্নীলার নাইক্যংখালী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মরহুম আলহাজ্ব শাহছুফি হযরত মাওলানা জমির উদ্দিন (র.)। তাঁর পিতার নাম আলীচান্দ এবং মাতার নাম নুরুন্নিছা বেগম। জানা যায়, তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৮৮০ সালে।
তৎকালীন সময়ে নাইক্যংখালী গ্রামের জমিদার ছিলেন পরাক্রমশালী এক চৌধুরী। তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকত।
অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা
জনশ্রুতি রয়েছে, এক গভীর রাতে নুরুন্নিছা বেগম ঘুম ভেঙে উঠানে এসে দেখেন এক শুভ্র পোশাক পরিহিত পীরসদৃশ ব্যক্তিকে ঘোড়ার পিঠে। তিনি জানান, তাঁর গর্ভে এমন এক মহাপুরুষ জন্ম নেবেন, যিনি জাতির কল্যাণে কাজ করবেন। এরপর তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। পরবর্তীতে সেই গর্ভজাত সন্তানই হন বিশিষ্ট আলেম হযরত মাওলানা জমির উদ্দিন (র.)।
শিক্ষা জীবন
তাঁর শৈশবে এলাকায় কোনো স্কুল বা মাদ্রাসা ছিল না। ফলে দূরের পানখালী গ্রামে গিয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে রামুর বিখ্যাত আলেম মাওলানা মোজাহের সাহেবের নিকটও কিছুদিন পড়াশোনা করেন।
মাত্র বারো বছর বয়সে তিনি পরিবারকে না জানিয়ে ভারতের মীরাট-এর আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনার জন্য চলে যান।
জ্ঞান ও কর্মজীবন
শৈশব থেকেই তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ছিল। মাত্র একবার পড়লেই অনেক বিষয় মুখস্থ হয়ে যেত। মাত্র নয় বছরে তিনি আরবি, ফারসি ও ইসলামি জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
পরে তিনি মীরাট ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মুহাদ্দিস ও মুফতির দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হয়, তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি সেখানে এ ধরনের সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
সেখানে অবস্থানকালে তিনি “হাদিয়া জমির” বা “ওয়াজে বেনজির” নামক গ্রন্থ রচনা করেন এবং “শেরে বাংলা” উপাধিতে ভূষিত হন।
দাম্পত্য জীবন
তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের ছিল না। প্রথমে তিনি তাঁর শিক্ষক মাওলানা নেজামুদ্দিন সাহেবের কন্যাকে বিয়ে করেন, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে শ্বশুরের নির্দেশে তিনি আরও দুইবার বিবাহ করেন।
হজ ও শেষ জীবন
জীবনের শেষ সময়ে তিনি পবিত্র হজ পালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন এবং হজ সম্পন্ন করে মহানবী (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করেন।
১২ এপ্রিল ১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও ইসলামিয়া তমিজিয়া মাদ্রাসায় দেশের আলেম সমাজ তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করে।
ইন্তেকাল
১৯৮১ সালের ২০ জুলাই, সোমবার তিনি ১০১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তাঁকে মৌলভীবাজার জামে মসজিদের ডান পাশে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি এক স্ত্রী, চার পুত্র, ছয় কন্যা এবং অসংখ্য ভক্ত-শিষ্য রেখে যান।
প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহ
তিনি জীবদ্দশায় বহু ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
জমিরিয়া দারুল কুরআন আলিম মাদ্রাসা
শাহ জমিরিয়া হিফজুল কুরআন মাদ্রাসা
মৌলভীবাজার জমিরিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ
নাইক্যংখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
আল্লাহ তাআলা তাঁর রুহের মাগফিরাত দান করুন। আমীন।



















